বিশ্ব জলবায়ুর ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ও অশনিসংকেত ঘটাল ২০২৬ সালের অতি-শক্তিশালী ‘এল নিনো’ (El Niño)। মধ্য বিষুবীয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সমুদ্রের উপরিভাগের তাপমাত্রা প্রথমবারের মতো রেকর্ড গড়ে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস স্পর্শ করেছে। আধুনিক আবহাওয়া রেকর্ড রাখা শুরুর পর থেকে এই অঞ্চলে এত উচ্চ তাপমাত্রা আর কখনো দেখা যায়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ক্রমেই ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে এই প্রাকৃতিক পরিবর্তন, যার চরম প্রভাব পড়তে পারে ভারতসহ গোটা দক্ষিণ এশিয়া ও বৈশ্বিক আবহাওয়া ব্যবস্থায়।
ইতিহাসের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংস্থা **ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফিয়ারিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (NOAA)**-এর তথ্যানুযায়ী, গত ২২ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে এল নিনোর মূল পর্যবেক্ষণ অঞ্চল—মধ্য বিষুবীয় প্রশান্ত মহাসাগরে পানির তাপমাত্রা ৩০ degree Celsius অতিক্রম করে। এর আগে ২০১৫ সালে সর্ব্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল ২৯.৮২ degree Celsius।
**ওয়ার্ল্ড মেটিওরোলজিক্যাল অর্গানাইজেশন (WMO)** জানিয়েছে, অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে মধ্য ও পূর্ব ক্রান্তীয় প্রশান্ত মহাসাগরের তাপমাত্রা চরম শিখরে পৌঁছাবে। সাধারণ হিসাব অনুযায়ী, আগামী ডিসেম্বরে এই এল নিনো তার পূর্ণ শক্তিতে রূপ নেবে।
এক নজরে এল নিনোর ভয়াবহতা
জুন ২০২৬:** স্বাভাবিকের চেয়ে ১.৬ degree Celsius বেশি।
আগস্ট ২০২৬:** স্বাভাবিকের চেয়ে ২.৫ degree Celsius বেশি।
অক্টোবর-ডিসেম্বর (পূর্বাভাস):** স্বাভাবিকের চেয়ে **৩.৭ degree Celsius** পর্যন্ত বেশি হতে পারে, যা ২০১৫-১৬ সালের রেকর্ডকেও (২.৬ degree Celsius) পেছনে ফেলে দেবে।
কেন উদ্বেগের কারণ এই উষ্ণায়ন?
‘এল নিনো’ মূলত একটি প্রাকৃতিক জলবায়ুগত চক্র, যার কারণে প্রশান্ত মহাসাগরের ক্রান্তীয় অঞ্চলের পানির উপরিভাগ অস্বাভাবিক গরম হয়ে ওঠে। তবে মহাসাগরের এই তাপমাত্রা বৃদ্ধি শুধুই পানিতে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি বৈশ্বিক বাতাসের গতিপথ ও মেঘ চলাচলের প্রবাহকে এলোমেলো করে দেয়। এর প্রভাবে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে অতিবৃষ্টি, বন্যা, খরা এবং দাবানলের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ কয়েক গুণ বেড়ে যায়।
দক্ষিণ এশিয়া ও ভারতের ওপর কী প্রভাব পড়তে পারে?
বিজ্ঞানীরা সতর্ক করছেন, এল নিনোর এই তাণ্ডব সরাসরি প্রভাব ফেলবে বর্ষা ও তাপমাত্রা ব্যবস্থার ওপর।
বৃষ্টিপাতে চরম অনিশ্চয়তা:** ভারতীয় আবহাওয়া দপ্তর (IMD)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর মাধ্যমে স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ১৩% কম বৃষ্টিপাত হয়েছে।
শীতকালীন তাপমাত্রা বৃদ্ধি:** ডব্লিউএমও (WMO)-এর অক্টোবর মাসের দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, আগামী মাসগুলোতে দক্ষিণ এশিয়ার বেশিরভাগ অঞ্চলে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তাপমাত্রা বা তুলনামূলক উষ্ণ পরিবেশ অনুভূত হবে।খরা ও চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি:** অক্টোবর-ডিসেম্বর মেয়াদে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্য ও দক্ষিণ অংশে বৃষ্টিপাত স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কম হওয়ার আশঙ্কা প্রবল।
পরিস্থিতি ২০২৭ পর্যন্ত গড়ানোর আশঙ্কা
জলবায়ু বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, মহাসাগরের এই মারাত্মক উষ্ণ পরিস্থিতি ২০২৭ সালের শুরুর দিক পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। ফলে বিশ্বজুড়ে কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা ও মানব স্বাস্থ্যের ওপর এর বিরূপ প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, সেদিকে প্রতিনিয়ত কড়া নজর রাখছেন গবেষকরা।


