টেনেরিফ ফরোয়ার্ড জেসুস দে মিগুয়েলের সাথে গোলরক্ষকের মারাত্মক ধাক্কা এবং পরবর্তীতে তাঁর মৃত্যুর ঘটনার পর ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই বৈশ্বিক আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছেন অ্যান্ডোরার গোলরক্ষক জেসুস ওওনো।
সোমবারের লা লিগা ২-এর ম্যাচে অতিরিক্ত সময়ে অ্যান্ডোরার গোলরক্ষক ওওনোর একটি উচ্চ ফাউলের (হাই চ্যালেঞ্জ) মুখে পড়ে কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে আক্রান্ত হন দে মিগুয়েল। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার সকালে সান্টা ক্রুজের হাসপাতালে ৩০ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
মাঠের এই ফাউলের জন্য ওওনোকে সরাসরি লাল কার্ড দেখানো হয়েছিল। এই ট্র্যাজেডিতে তাঁর ভূমিকার জন্য তিনি বিশ্বজুড়ে তীব্র সমালোচনার শিকার হচ্ছেন। অন্যদিকে স্থানীয় পুলিশ এই ঘটনার আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করেছে বলে জানা গেছে।
জেসুস ওওনো কে?
২৫ বছর বয়সী গোলরক্ষক জেসুস ওওনো নিরক্ষীয় গিনির (Equatorial Guinea) বাটাতে জন্মগ্রহণ করলেও শৈশবেই স্পেনের বাস্ক কান্ট্রিতে চলে যান।
আট বছর বয়সে সান সেবাস্তিয়ানের যুব ক্লাব ‘অ্যান্টিগুওকো’তে তাঁর ফুটবল ক্যারিয়ার শুরু হয়। পরবর্তীতে রিয়াল সোসিয়েদাদে যোগ দেওয়ার পর তিনি বাস্ক কান্ট্রির অনুর্ধ-১৬ দলের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করেন। ২০১৭ সালে আলাভেসের একাডেমি দলে যোগ দিয়ে ২০২২ সালের জানুয়ারিতে সিনিয়র দলে অভিষেক হয় তাঁর। এর মাধ্যমে নিজের দেশে জন্মগ্রহণকারী প্রথম আন্তর্জাতিক খেলোয়াড় হিসেবে লা লিগায় খেলার কীর্তি গড়েন তিনি।
আলাভেসের হয়ে লা লিগা ও কোপা দেল রে মিলিয়ে ২০টি ম্যাচ খেলার পর গত মৌসুমে ধারে লা লিগা ২-এর ক্লাব অ্যান্ডোরাতে যোগ দেন তিনি। সেখানে ২০টি লিগ ম্যাচে ৬টি ক্লিন শিট রেখে পারফরম্যান্সের সুবাদে চলতি বছরের আগস্টে দুই বছরের স্থায়ী চুক্তি স্বাক্ষর করেন। এছাড়া ২০১৯ সাল থেকে নিরক্ষীয় গিনির জাতীয় দলের হয়ে ৪৬টি ম্যাচ খেলেছেন তিনি।
ধাক্কা লাগার পর ওওনোর প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল?
মাঝমাঠে দে মিগুয়েলের সাথে সংঘর্ষের পর ওওনো পেছনে ফিরে মাঠে শুয়ে থাকা প্রতিপক্ষের অবস্থা দেখার চেষ্টা করেননি। রেফারি মানুয়েল আনহেল পেরেজ হার্নান্দেজ তাঁকে সরাসরি লাল কার্ড দেখাবেন—তা আগে থেকেই বুঝতে পেরে তিনি টাচলাইনের দিকে হাঁটতে শুরু করেন।
তবে সতীর্থ নাচো কুইন্টানার সাথে করমর্দন করে বের হয়ে যাওয়ার সময় চিকিৎসাকর্মীদের দ্রুত মাঠে ঢুকতে দেখে তিনি পেছনে ফিরে আসেন এবং দে মিগুয়েলকে ঘিরে থাকা খেলোয়াড়দের সাথে যোগ দেন। মাঠের অপর প্রান্তের গেট দিয়ে যখন স্ট্রেচারে করে দে মিগুয়েলকে অ্যাম্বুলেন্সে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তখন ক্লাব কর্মকর্তাদের সাথে ওওনো টানেলে প্রবেশ করা পর্যন্ত মাঠেই অবস্থান করছিলেন। অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, গ্যালারির টেনেরিফ সমর্থকরা তাঁকে লক্ষ্য করে "খুনি" বলে স্লোগান দিচ্ছেন।
কেন ওওনো সাইবার বুলিংয়ের শিকার হচ্ছেন?
খেলার ৮৩ মিনিটে ২-০ ব্যবধানে পিছিয়ে থাকা ১০ জনের অ্যান্ডোরা যখন সমতায় ফিরতে মরিয়া, তখন গোলরক্ষক ওওনো তাঁর পেনাল্টি বক্স থেকে অনেক দূরে অবস্থান করছিলেন। টেনেরিফ নিজেদের বক্স থেকে বলটি বাতাসে ভাসিয়ে ক্লিয়ার করলে, বলের নিয়ন্ত্রণ নিতে দৌড়ে আসা দে মিগুয়েলকে আটকাতে শূন্যে লাফিয়ে চ্যালেঞ্জ করেন ওওনো। এ সময় তাঁর হাঁটু সজোরে দে মিগুয়েলের বুক ও মাথায় আঘাত করে।
ঘটনার পর থেকেই সামাজিক মাধ্যমে ওওনোকে ফুটবল থেকে আজীবন নিষিদ্ধ করা এবং ফৌজদারি মামলা দায়েরের দাবি উঠেছে। এমনকি তাঁর ব্যক্তিগত প্রোফাইলে বর্ণবাদী মন্তব্য ও গালিগালাজ করা হচ্ছে।
স্প্যানিশ ফুটবল কর্তৃপক্ষ ও আইনি ব্যবস্থার মুখোমুখি ওওনো
স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশনের শৃঙ্খলা বিধি (Disciplinary Code) অনুসারে, মাঠের ভেতরে কোনো খেলোয়াড় মারাত্মক হিংসাত্মক ফাউল করলে এবং তার ফলে গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনা ঘটলে ৪ থেকে ১২ ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হতে পারে। তদন্ত সাপেক্ষে ওওনোর চূড়ান্ত শাস্তি নির্ধারিত হবে।
এদিকে, সান্টা ক্রুজের জাতীয় পুলিশের হোমিসাইড গ্রুপ (Homicide Group) দে মিগুয়েলের মৃত্যুর পরিস্থিতি তদন্ত করছে বলে স্থানীয় গণমাধ্যমে জানানো হয়েছে। ফুটবল মাঠে এ ধরনের মৃত্যুর ঘটনা অত্যন্ত বিরল হওয়ায় এর আগে সরাসরি কোনো আইনি নজির নেই। তবে ওওনোর ওই বিপজ্জনক আঘাত স্প্যানিশ পেনাল কোডের ১৪২ অনুচ্ছেদের আওতায় ‘অপরাধমূলক অবহেলা’ (criminal negligence) হিসেবে প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ চার বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড কিংবা ৩ থেকে ১৮ মাসের আর্থিক জরিমানা হতে পারে।