ইরান-সমর্থিত হুথিরা জানিয়েছে যে তারা রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নতুন করে একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। এদিকে সৌদি আরব ইয়েমেনি বিদ্রোহীদের ধারাবাহিক হামলা প্রতিহত করতে তাদের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেন ব্যর্থ হলো, তা খতিয়ে দেখছে। সিনহুয়া নিউজ এজেন্সির একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, হুথির সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারিয়া জানিয়েছেন যে বিদ্রোহী গোষ্ঠীটি একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে রিয়াদ বিমানবন্দরকে লক্ষ্যবস্তু করে এবং দাবি করেছে যে ক্ষেপণাস্ত্রটি "সঠিকভাবে লক্ষ্যে আঘাত হেনেছে"।
এছাড়াও হুথিরা দাবি করেছে যে তারা দক্ষিণ-পশ্চিম সৌদি আরবের খামিস মুশাইতের কিং খালিদ বিমান ঘাঁটিতে ড্রোন হামলা চালিয়েছে এবং এতে সরাসরি আঘাত হেনেছে। এদিকে, হুথিদের বিরুদ্ধে লড়াইরত সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট জানিয়েছে যে তাদের বাহিনী রিয়াদের দিকে ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীটির নিক্ষিপ্ত একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সফলভাবে প্রতিহত করেছে। জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকি 'এক্স' (X)-এ লিখেছেন, "রিয়াদের দিকে সন্ত্রাসী হুথি মিলিশিয়ার নিক্ষিপ্ত একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত ও ধ্বংস করা হয়েছে।"
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সৌদি কর্মকর্তা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে এও জানিয়েছেন যে, সম্প্রতি বিমান হামলাগুলো কেন হলো এবং কেন এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমগুলোর পক্ষ থেকে আগে কোনো সতর্কবার্তা পাওয়া যায়নি, সে বিষয়ে তদন্ত চলছে। এসব হামলায় হুথির ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোনগুলো ১,০০০ কিলোমিটারের বেশি পথ পাড়ি দিয়ে রিয়াদে এসে পৌঁছায়।
গত সপ্তাহ থেকে সৌদি বিমানবন্দরগুলোতে হুথিদের ধারাবাহিক হামলার মধ্যে এটি অন্যতম। এই ঘটনা সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতাগুলোকে উন্মোচন করেছে এবং মধ্যপ্রাচ্যে সাত মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা সংঘাতকে এক বিপজ্জনক মোড়ে নিয়ে গেছে, যা শুরু হয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে। এটি হুথিরা আসলে কারা এবং কেন সৌদি কর্তৃপক্ষ তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে ক্রমবর্ধমানভাবে হিমশিম খাচ্ছে, সে প্রশ্নও সামনে নিয়ে এসেছে।
হুথিদের উৎপত্তি
হুথিরা হলো একটি সামরিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় আন্দোলন, যা উত্তর-পশ্চিম ইয়েমেনের বেশিরভাগ অংশ শাসন করে এবং লোহিত সাগরে পণ্যবাহী জাহাজ ও ট্যাংকারের ওপর হামলার মাধ্যমে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারকে ব্যাহত করেছে। ১৯৯০-এর দশকে ইয়েমেনের উত্তরের দূরবর্তী অঞ্চলে শিয়া ইসলামের জায়েদি ধারার পুনরুজ্জীবন আন্দোলন হিসেবে এই গোষ্ঠীটি আত্মপ্রকাশ করে। এই জায়েদিরা একসময় ইয়েমেন শাসন করেছিল, কিন্তু তাদের উত্তরের মূল ভূখণ্ডটি পরবর্তীতে দরিদ্র ও প্রান্তিক হয়ে পড়েছিল।
গোষ্ঠীটি ইয়েমেনের জাতীয় সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বেশ কিছু গেরিলা যুদ্ধ এবং সুন্নি সৌদি আরবের সাথে সংক্ষিপ্ত সীমান্ত সংঘাতে লিপ্ত হয়। ২০১১ সালের "আরব বসন্ত" বিক্ষোভে ইয়েমেনের দীর্ঘকালীন প্রেসিডেন্ট আলী আবদুল্লাহ সালেহ ক্ষমতাচ্যুত হলে, গোষ্ঠীটি উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যস্থতায় হওয়া রাজনৈতিক রূপান্তর প্রত্যাখ্যান করে উত্তর ইয়েমেনের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ সুসংহত করে। এদিকে ইরানের সমর্থনে গোষ্ঠীটির গোপন নেতা আব্দুল মালিক আল-হুথি তার পাহাড়ী যোদ্ধাদের নিয়ে দশ হাজার মানুষের একটি শক্তিশালী বাহিনী গড়ে তোলেন।
২০১৪ সালে তারা রাজধানী সানা দখল করে এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে দক্ষিণে এডেনের দিকে পিছু হটতে বাধ্য করে। হুথি আন্দোলন নিজেদের "আনসার আল্লাহ" (আল্লাহর রক্ষক) বলে অভিহিত করে। "হুথি আন্দোলন" নামটি জনপ্রিয় হয়েছে এর প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত নেতা হুসেইন বদরুদ্দিন আল-হুথির নামানুসারে।
সৌদিদের সঙ্গে হুথি সংঘাতের নেপথ্যে কী রয়েছে?
ইয়েমেনে ক্রমবর্ধমান ইরানি প্রভাব এবং সীমান্তে বিশৃঙ্খলার আশঙ্কায়, সৌদি আরব ২০১৫ সালের শুরুর দিকে হুথিদের হটিয়ে সরকারকে পুনর্বহাল করতে এবং রূপান্তর পরিকল্পনা পুনরুজ্জীবিত করার উদ্দেশ্যে দেশটিতে সামরিক হস্তক্ষেপ করে।
এর ফলে সৃষ্ট গৃহযুদ্ধ বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম মানবিক সংকটের জন্ম দেয় এবং সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো জোটের শরিকদের তীব্র লড়াই ও ধ্বংসাত্মক বিমান হামলার বছর পার করতে হয়।
যাহোক, ইয়েমেনের পাহাড়ি ভূখণ্ডে কোনো পক্ষই তেমন সুবিধা করতে পারেনি এবং বেশিরভাগ জনসংখ্যার বসবাসস্থল উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ হুথিদের হাতেই রয়ে গেছে। তারা উল্লেখযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা প্রদর্শন করে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের তেল স্থাপনা এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হামলা চালিয়েছে।
বছরের পর বছর ধরে চলা যুদ্ধের পর, জাতিসংঘ যুদ্ধরত পক্ষগুলোর মধ্যে ২০২২ সালে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তির মধ্যস্থতা করে, যা চলতি বছর পর্যন্ত শান্তি বজায় রেখেছিল।
সুমদ্রে হুমকি
গাজায় ইসরায়েলের শুরু করা যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ফিলিস্তিনিদের সমর্থনের কথা বলে হুথিরা ২০২৩ সালের নভেম্বর মাসে লোহিত সাগরের জাহাজ লক্ষ্য করে গুলি চালানো এবং ইসরায়েলের দিকে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ শুরু করে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইরানবিরোধী যুদ্ধের প্রতিক্রিয়ায় লোহিত সাগরের শিপিং এবং সৌদি আরবের ওপর সেই হামলাগুলো এ বছর আবার শুরু হয়। মার্কিন ও ইজরায়েলি বাহিনী ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পর তেহরান হরমুজ প্রণালীর শিপিং ট্রাফিক ব্যাহত করে, যার ফলে সৌদি আরব তার লোহিত সাগরের বন্দর এবং বাব আল-মানতেবের মাধ্যমে তেল রপ্তানি বাড়াতে বাধ্য হয়।
এর ফলে সৌদি জ্বালানি অবকাঠামো এবং শিপিং আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে হুথিরা লোহিত সাগরের মুখে কৌশলগত পেরিম দ্বীপ এবং মোচা বন্দর শহর দখল করে নেয়, কারণ তারা ইরানের পক্ষে যুদ্ধে সহায়তা করার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট বাব আল-মানতেব প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিতে চেয়েছিল।
মোট বৈশ্বিক সমুদ্র বাণিজ্যের প্রায় ১০ থেকে ১২ শতাংশ এই প্রণালী দিয়েই পরিবাহিত হয়।
লোহিত সাগর রুট দিয়ে হুথিদের এই অবরোধ বৈশ্বিক বাণিজ্যকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে। এটি ইউরোপ এবং এশিয়ার মধ্যে চলাচলকারী পণ্যবাহী জাহাজগুলোকে আফ্রিকা ঘুরে একটি দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল পথ বেছে নিতে বাধ্য করে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট বাড়িয়ে তোলে।
সৌদি সমর্থিত ইয়েমেনি বাহিনী হুথিদের কাছ থেকে ভূখণ্ড পুনর্দখলের চেষ্টা করায় এবং সৌদি আরব গোষ্ঠীটির বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান পুনরায় শুরু করায় ২০২৬ সালের অক্টোবর মাসে সংঘাত আবার তীব্র আকার ধারণ করে।
বৈশ্বিক জ্বালানি শক্তিধর রাষ্ট্র সৌদি আরব
সৌদি আরব তার তেল আধিপত্যের কারণে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী জ্বালানি চালিকাশক্তি এবং একটি প্রধান ভূ-রাজনৈতিক শক্তি। সামগ্রিক বিশ্ব তেল উৎপাদনের ক্ষেত্রে সৌদি আরব মোট উৎপাদনের প্রায় ১১ শতাংশ উৎপাদন করে।
বিশ্বের মোট প্রমাণিত পেট্রোলিয়াম রিজার্ভের প্রায় ১৫ থেকে ১৭ শতাংশ এই রাজ্যের দখলে রয়েছে। তেল ও গ্যাস খাত এর জিডিপির প্রায় ৫০ শতাংশ এবং রপ্তানি আয়ের প্রায় ৭০ শতাংশ জোগান দেয়।
হুথিদের শক্তি
হুথিরা ইয়েমেনি ভূখণ্ডের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ নিয়ন্ত্রণ করে, যেখানে জনসংখ্যার প্রায় ৭০ শতাংশ বাস করে। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাদের প্রায় ১৮০,০০০ থেকে ২০০,০০০ সশস্ত্র যোদ্ধা রয়েছে। ট্যাংক এবং টেকনিক্যাল ভেহিকল থেকে শুরু করে অ্যান্টি-ট্যাংক গাইডেড মিসাইল এবং দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মতো অস্ত্র ব্যবস্থার নাগাল রয়েছে তাদের হাতে।
তাদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ইসরায়েল পর্যন্ত আঘাত হানতে সক্ষম এবং তাদের নিখুঁত নিশানার প্রমাণ মিলছে সৌদি বিমানবন্দর ও তেল স্থাপনার মতো নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার মাধ্যমে।
এছাড়াও ইয়েমেন লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সাথে সংযোগকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ জলপথ বাব আল-মানতেব প্রণালীর কাছাকাছি অবস্থিত হওয়ায়, হুথিরা সামুদ্রিক বাণিজ্যের ওপর বিশেষ কৌশলগত সুবিধা ভোগ করে।
ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক
লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং ইরাকি শিয়া মিলিশিয়াদের পাশাপাশি ইরান হুথিদের তাদের আঞ্চলিক "প্রতিরোধ অক্ষ"-এর অংশ হিসেবে সমর্থন করে। তবে অন্যান্য গোষ্ঠীগুলোর তুলনায় ইয়েমেনি আন্দোলনের সাথে ইরানের সম্পর্ক কিছুটা ভিন্ন প্রকৃতির।
হিজবুল্লাহ বা ইরাকি গোষ্ঠীগুলোর মতো হুথিরা ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে তাদের চূড়ান্ত ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না। আদর্শগতভাবে ইরানের সাথে মিল থাকলেও তাদের মূল লক্ষ্যগুলো মূলত অভ্যন্তরীণ।
যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, হিজবুল্লাহর সহায়তায় ইরান হুথিদের অস্ত্র, তহবিল ও প্রশিক্ষণ দিয়েছে। তবে হুথিরা নিজেদের ইরানের প্রক্সি হিসেবে অস্বীকার করে এবং জানায় যে তারা নিজেরাই অস্ত্র তৈরি করে।
হুথিদের বিরুদ্ধে লড়াই করা এত কঠিন কেন?
হুথিরা দুর্গম পাহাড়ি ভূখণ্ড এবং বিস্তীর্ণ মরুভূমি থেকে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে। সৌদি আরব সমর্থিত সরকারপন্থী বাহিনী দেশটির লাহেজ গভর্নরেটের শাব-আল-জিনের মতো মরুভূমি অঞ্চলে বিদ্রোহীদের সাথে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।
দুর্গম অঞ্চল থেকে কার্যক্রম চালানো এই গোষ্ঠীকে হটিয়ে দিতে হুথি আস্তানায় চালানো বিমান হামলাগুলো ব্যর্থ হয়েছে।
গোষ্ঠীটির অস্ত্রাগারেও রয়েছে বিশাল ভাণ্ডার। তাদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ইয়েমেন থেকে প্রায় ২,০০০ কিলোমিটার দূরে ইসরায়েল পর্যন্ত পৌঁছাতে সক্ষম এবং সৌদি বিমানবন্দর ও তেল স্থাপনার মতো নির্দিষ্ট লক্ষ্যে নিখুঁত আঘাত হানতে পারে।
বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত করতে গোষ্ঠীটি বিভিন্ন গতির ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের মিশ্রণে একযোগে অস্ত্র ব্যবহার করে আসছে। তাদের সবচেয়ে উন্নত বিকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে মাঝারি পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র যেমন 'ফিলিস্তিন-২' (হাইপারসনিক সক্ষমতা সম্পন্ন দ্বিমুখী সলিড ফুয়েল ক্ষেপণাস্ত্র) এবং 'তুফান' (যা ইরানের তৈরি 'ঘদর' ক্ষেপণাস্ত্রের একটি পরিবর্তিত সংস্করণ বলে মনে হয়)।
আল জাজিরার একটি প্রতিবেদন অনুসারে, বিদ্রোহীদের কাছে বুরকান এবং বদর সিরিজের মতো বেশ কিছু স্বল্পপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রও রয়েছে, যা ইরানি উৎসের বলে মনে করা হয়।